বাংলাদেশের অন্তরের গভীরে, এক নীরব গ্রামে, যেখানে সময় যেন ধীর হয়ে যায়, সরু একটি পথ বয়ে গেছে ঝিলমিল করা পুকুরের ধারে আর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা নারিকেল গাছের জঙ্গলের মাঝ দিয়ে। বিকেলের সোনালি আলো — ঠিক বিকেল ৫টা ১৭ মিনিটে — চারপাশকে ঢেকে দিয়েছে এক স্বপ্নিল আভায়। বাতাসে ভাসছে সোঁদা মাটির ঘ্রাণ আর টাটকা সবুজ পাতার সুগন্ধ।
এই পথ ধরে এগিয়ে আসেন এক বৃদ্ধ মানুষ, নাম আবদুল করিম। সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত, হাতে ছোট্ট এক ব্যাগ ভর্তি মাছের খাবার। প্রতিদিন এই সময়েই তিনি এই পথ ধরে হাঁটেন পুকুরের ধারে, যেখানে অপর প্রান্তে তার নাতি-নাতনিরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে। তারা জানে, এটা শুধু মাছ খাওয়ানোর সময় নয় — এ সময় গল্পেরা জীবন্ত হয়ে ওঠে।
পুকুরের কাছে পৌঁছাতেই মাছগুলো ভেসে ওঠে, যেন আশার ছোট ছোট বুদবুদ ভেঙে উঠছে জলের বুকে। আবদুল করিম মুঠো মুঠো খাবার ছুঁড়ে দেন পুকুরে, আর শুরু করেন গল্প বলা — তার শৈশবের কাহিনি, হারিয়ে যাওয়া নদীর কথা, তাণ্ডব ঝড়ের স্মৃতি, কিংবা সেই সময়ের গল্প যখন তিনি নিজের হাতে লাগিয়েছিলেন এই নারিকেল গাছগুলো, যেগুলো এখন আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তার পেছনে, গ্রাম ধীরে ধীরে দিনের কাজ গুটিয়ে নিচ্ছে। একটি গরু নিশ্চিন্তে চরছে টিনের ছাদের ঘরের পাশে, দূরের একটি চুলা থেকে ধোঁয়া উড়ছে — কেউ হয়তো ভাত বসিয়েছে। সবুজের প্রাচুর্য যেন চোখে লাগে — উজ্জ্বল, সজীব, জীবন্ত — মনে করিয়ে দেয়, এখানে প্রকৃতি এখনও অক্ষত, এখনও পবিত্র।
এক অপরিচিতের কাছে এই জায়গা হয়তো সাদামাটা মনে হবে, কিন্তু এখানকার মানুষের কাছে এই পথ আর বিকেল ৫টা ১৭ মিনিটের এই রীতি বহন করে প্রজন্মের স্মৃতি, ভালোবাসা আর জীবনের স্পন্দন। এটা শুধু একটি পথ নয় — এটা অতীত আর বর্তমানের সেতুবন্ধন, দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবীর বুকে নীরব ধারাবাহিকতার প্রতীক।

No comments:
Post a Comment